৫.৩৬ মানসিক বিপত্তি
শিশুদের প্রধান প্রধান আচরণ বিকাশের পর্যায়ে সম্ভাব্য বিপদ প্রচ্ছন্ন থাকে যা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিযোজনের উপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করার মধ্যে দিয়ে মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এরকম খুব সাধারণ বিপত্তি সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল।
ক) কথা সংক্রান্ত বিপত্তি: আমরা জানি যে, কথা অন্যের সাথে যোগাযোগ (
রক্ষার একটি উপায়। এও জানি যে দলের সভ্য হতে গেলে কথার একান্ত প্রয়োজন। তাই কোন শিশু অন্যান্য সমবয়সীদের মতো কথা না বলতে পারলে তার সামাজিক অভিযোজন বিঘ্নিত হয়। পরিশেষে সে নিজেকে তুচ্ছ ও হেয় মনে করে।
ভাব বিনিময় ক্ষমতা অর্জনের ধারায় চার জাতীয় বিঘ্ন ঘটতে পারে। কেউই এমন আশা করতে পারে না যে শিশুদের কাছে বোধগম্য নয় এমন শব্দ কিম্বা তাদের কাছে অপরিচিত তেমন শব্দ উচ্চারণ অথবা খুব তাড়াতাড়ি কথা বলা হলে এ বয়সে শিশুর সেসব কথা বোঝা উচিত।
প্রথমত এ বয়সে কানে খাটো হওয়া অন্যের কথা না বোঝার অন্য একটি কারণ। ছোট শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক থাকে সেজন্য অন্যে কি বলছে বোঝার চেয়ে নিজেদের বক্তব্য খুব আগ্রহের সাথে বলতে চায়। ফলে, অন্যান্যরা কি বলছে ও সে নিজে কি বলেছে তার মধ্যে কোন সামঞ্জস্য থাকে না। এরকমভাবে সমবয়সী অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা ব্যাহত হয়।
দ্বিতীয়ত কারো কথা কানে শুনতে না পেলে শিশুর কথা বলা যতটা বিঘ্নিত হয় তার চেয়েও অনেক বেশি বিপত্তির উদ্ভব হয় তখনই যখন দেখা যায় যে শিশুর মধ্যে ভাষা দুর্বলতা বিদ্যমান। অর্থাৎ অশুদ্ধ ভাষা অনুকরণে ও তোহ্লামি, আধো-আধো কথা বলা ইত্যাদি সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে। এসব কারণে শিশুদের ভাষায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত যেসব শিশু একই সাথে দুটি ভাষায় কথা বলে তাদের সামাজিক অভিযোজন বিঘ্নিত হয়। এও দেখা যায় যেসব শিশু গৃহে বিদেশী ভাষায় কথা বলে তারা সমাজে সংখ্যা গরিষ্ঠের ভাষা খুব কম জানে বলে খেলাধূলা করার সময় সঙ্গীদের সাথে ভালভাবে কথা বলতে পারে না। অন্য শিশুরা তাদের কি বলছে তাও বুঝতে পারে না। শৈশবের প্রথম বছরগুলোতে এরকম অসুবিধা সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে তেমন বাধা সৃষ্টি করতে পারে না, কেননা খেলায় কেউ কারো প্রতিক্রিয়া অনুকরণ করে না। কিন্তু তারপর সহযোগিতাপূর্ণ খেলাধূলার ধারা শুরু হলে দোভাষী শিশুরা এত অসুবিধার সম্মুখীন হয় যে প্রায়ই সমবয়সীদের...
তবে তা মানতে চায় না। আরো শোচনীয় ব্যাপার হলো যে সান্তাক্লজের কথা বলে তাদের কেউ কেউ ঠকিয়েছে মনে করে খৃস্টমাস আর তাদের মনে কোনো উৎসাহের সঞ্চার করতে পারে না।
৫.৩৯ নৈতিক বিকাশের বিপত্তি
শৈশবের প্রথম পর্যায়ে নৈতিকতা বিকাশের ক্ষেত্রে চারটি সাধারণ বিপত্তি দেখা যায়। প্রথমত সামঞ্জস্যহীন নিয়মানুবর্তিতার ফলে সামাজিক প্রত্যাশা মেনে চলার গতি শ্লথ হয়ে যায়। বিশেষ একটি আচরণ যদি ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে শেখান তবে সে কাজটি একবার সঠিক বলে বিবেচিত হয়েছিল অন্য সময় একই কাজ কেন ভুল বিবেচিত হল শিশুরা তা বুঝতে না পেরে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। একইভাবে কোনো কাজের জন্য একবার পেলে পরবর্তীতে আবার সেই কাজটি প্রশংসিত হলেও এ বয়সে শিশু হতবাক হয়ে যায়। বয়স্ক ব্যক্তিদের এরকম অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনোভাব শিশুটিকে ভীরু করে দেয় ও শাস্তি পাবে ভয়ে ভীত হয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।
দ্বিতীয়ত অন্যায় আচরণ শোধরানো না হলে অথবা অসদাচরণ করে সাময়িকভাবে প্রশংসা অর্জনের ফলে সাথীদের কাছে ঈর্ষার পাত্র হলেও এরকম অনেক শিশু অন্যায় আচরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে গুয়েক (Gluech) ২৬ বলেছেন যে দুই/তিন বছর বয়সে অন্যায় কাজের চেয়ে অন্যায় কাজ করার প্রতি তাদের মনোভাব লক্ষ্য করে শিশু অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়।
তৃতীয়ত অন্যায় কাজের জন্য স্কুল-পূর্ব বয়সের শিশুদের গুরুতর শাস্তি দিলে অথবা ভাল কাজের জন্য পুরস্কৃত করার বিষয়টির উপর গুরুত্ব না দেওয়া হলে বয়স্কদের প্রতি শিশুরা বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে শেখে। যেসব শিশুকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয় কিন্তু কম প্রশংসা করা হয় তারা কোনো অন্যায় কাজ করে অনুশোচনা করার পরিবর্তে ক্ষুব্ধ হয় ও শাস্তিদাতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। শৈশবে শিশুকে শাস্তিদান তিনভাবে যুক্তিসঙ্গত-(১) যখন শাস্তি ছাড়া আর কোনো উপায়ে শিশুকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত করা যায় না; (২) গর্হিত একটি কাজ শিশু যখন করছে তখন শাস্তি দেওয়া অথবা (৩) লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শাস্তি প্রদানের আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে না যায়।
বিধিনিষেধের মধ্যে শিশু যখন পালিত হয় তখন তার আচরণ অভিভাবকের চতুর্থত নৈতিক বিকাশের চতুর্থ ও সবচেয়ে মারাত্মক বিপত্তি হলো, কড়া সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় নিজে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
#শিশুরবুদ্ধিরবিকাশ
#শিশুরনৈতিকবিকাশ